একটি ভৌতিক গল্প
ঘড়িতে তখন ২টা ৪৪ মিনিট।
ঘর নিস্তব্ধ, জানালার কাঁচে হালকা টোকা দিচ্ছে হাওয়া।
ঢাকার মিরপুরে একা এক ফ্ল্যাটে বসবাস করে সোহেল—বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে এখন চাকরির খোঁজে আছে। দিনের বেলা ইন্টারভিউ, আর রাতে বই-পত্র ঘাঁটা। তবে আজকের রাতটা অদ্ভুত রকমের চুপচাপ। যেন ঘরের মধ্যে কারও নিঃশ্বাস লুকিয়ে আছে।
সোহেল বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে মাত্র, তখনই—
ট্রিং… ট্রিং…
ট্রিং… ট্রিং…
ফোনটা বাজছে।
না, মোবাইল না। পুরনো সেই ল্যান্ডফোনটা, যেটা সে তার নানাবাড়ি থেকে এনে রেখেছিল সাজিয়ে রাখার জন্য। সেটা নাকি আর বাজে না, সিম-লাইনই বন্ধ।
কিন্তু এখন বাজছে।
ভয়ে বুক ধড়াস ধড়াস করলেও কৌতূহল তাকে ফোনের কাছে টেনে নেয়।
ফোনটা তোলে।
— “হ্যালো?”
কোনো উত্তর নেই। শুধু একটা নিঃশ্বাসের শব্দ।
— “কে বলছেন?”
কয়েক সেকেন্ড পর ফিসফিসে একটা মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল:
— “তুমি কি সোহেল?”
— “জি… আপনি কে?”
— “তুমি আমার মৃত্যুর সময় দেখেছিলে। মনে নেই?”
সোহেলের মাথায় বাজ পড়ার মতো শব্দ বাজে। হাত কেঁপে উঠে। কে এই কণ্ঠ? কী বলছে সে?
— “কী বলছেন আপনি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!”
কোনো উত্তর নেই। ফোন কেটে যায়।
সোহেল অবাক হয়ে ফোনটা রেখে দেয়। “শুধু প্র্যাঙ্ক”—ভেবে আবার ঘুমোতে যায়।
কিন্তু ঘুম আর আসে না।
📜 ফিরে দেখা অতীত
পরের দিনও সে অস্বস্তিতে কাটায়। সেই কণ্ঠটা বারবার কানে বাজে। সোহেল এবার নিজের স্মৃতি ঝালিয়ে নেয়।
সেই মেয়েটা…
দুই বছর আগে একবার রাজশাহী ভ্রমণে গিয়েছিল বন্ধুবান্ধব নিয়ে। এক বিকেলে রেললাইনের ধারে হেঁটে বেড়াতে বেরিয়েছিল একা। সেদিনই এক কিশোরীকে ট্রেনের ধাক্কায় মরতে দেখেছিল। সোজা চলছিল সে, হঠাৎ পিছন ফিরে সোহেলকে দেখে হেসে বলেছিল—“ভয় পেয়ো না।”
কিন্তু সে সরে দাঁড়ায়নি। কিছু বলেওনি।
তখন সে শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছিল। তারপর ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশে খবর দেয়নি, কাউকে বলেনি কিছুই। সে ছিল মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষী।
🌘 দ্বিতীয় রাত: ফিরে আসা
রাত ২:৪৪।
আবার ফোনটা বাজে।
ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…
এইবার সে ধরতে চায় না।
কিন্তু ফোন থামে না।
অবশেষে তুলে নেয়।
— “হ্যালো…”
— “আমি বলেছিলাম না, আমি ফিরে আসব?”
— “কে আপনি?”
— “আমি এখন জানালার পাশে। আয়নার দিকে তাকাও।”
সোহেল ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকায়… কিচ্ছু নেই।
আয়নার দিকে তাকাতেই শরীর বরফ হয়ে যায়।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে—ভেজা চুল, মুখে রক্ত, চোখে একরাশ অভিমান।
সে ঘুরে তাকায়। কিছু নেই।
আয়নার দিকে তাকায়—মেয়েটা আরও কাছে। ধীরে ধীরে ফিসফিসে কণ্ঠে বলে:
— “তোমার পালা।”
🧊 চূড়ান্ত রাত
সোহেল তার এক বন্ধু জাবেদকে ডেকে আনে, বোঝাতে চেষ্টা করে সব ঘটনা।
জাবেদ ভাবে, ও কেবল মানসিক চাপে আছে। ফোন তো পুরনো, বাজার কথাই না।
তবে রাত ২:৪৪-এ যখন আবার ফোনটা বেজে ওঠে, আর জাবেদ নিজের কানে সেই মেয়ের কণ্ঠ শোনে, তখন সে আর কোনো সন্দেহ রাখে না।
ফোনে ভেসে আসে:
— “তুমি তো ওর বন্ধু। এবার তুমি শুনবে আমার গল্প।”
এক মুহূর্ত পর ফোন বিস্ফোরণের মতো শব্দ করে নিচে পড়ে যায়। বাতি নিভে যায়।
ঘরজুড়ে জমে ওঠে ঠান্ডা কুয়াশা।
জাবেদ আর সোহেল দুজনেই জানে—এখন পালানোর কোনো উপায় নেই।
🩸 শেষ: মৃত্যু কখনো একা আসে না
সোহেল আর জাবেদকে পরদিন সকালে পাওয়া যায় না।
ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, অথচ ঘর ফাঁকা।
তবে পুরনো ল্যান্ডফোনটা চালু আছে। আর ফোনের রিসিভারে বাঁধা একটা ছোট কাগজে লেখা:
“সাক্ষী যে পালিয়ে যায়, তাকেই ফিরিয়ে আনতে হয়।”
লোকজন পরে জানায়, সেই ল্যান্ডফোনে কেউ কেউ মাঝরাতে এখনো ফিসফিসে কণ্ঠ শোনে।
সবাই বলে—ঘড়িতে ২:৪৪ বাজলে ফোনটা ধরো না।
কারণ ও পাশে মৃত্যু অপেক্ষা করে।

0 Comments