রুমের জানালার বাইরে ধীরে ধীরে আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসছিল। শহরের আলো ঝলমল করছিল, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো, সেই আলো যেন কখনও আমার ঘরে পৌঁছতে পারবে না। হাতে আমার হাতে ছিল সেই পুরনো ডায়েরি, যা বহুদিন ধরে আমি লুকিয়ে রেখেছি। আজ রাতে আমি সেই ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠা পড়ব।
শুরুটা...
সব শুরু হয়েছিল যখন আমি এক অদ্ভুত বাড়িতে ঢুকেছিলাম। বাড়িটা গ্রামের পাশে, শহর থেকে দূরে। নাম ছিল ‘আনন্দপুর’। ছোট্ট, পুরোনো, কালো ইটের ফাল আর চিরাচরিত বাংলার ছাদের সমাহার।
বাড়ির মালিকের মৃত্যুর পর, সেখানে অনেক বছর কেউ থাকে নি। অনেকেই বিশ্বাস করতো, বাড়িটা অভিশপ্ত।
আমি, মানস, একজন সাংবাদিক। ভূতের গল্প নিয়ে একটা স্পেশাল রিপোর্ট করার জন্য এই বাড়িটাতে গিয়েছিলাম।
বাড়ির ভিতর
প্রথম রাতেই আমি একটা ডায়েরি পেয়ে যাই। ডায়েরিটা ছিল ভীষণ পুরোনো, ছেঁড়া, পাতা হলুদ হয়ে গেছে। ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল—
“যে কেউ এই ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠা পড়বে, তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।”
আমি তবুও পড়া শুরু করলাম।
ডায়েরির প্রথম পাতা
“আমি রূপম। ১৯৮৫ সালে এই বাড়িতে আসি। এখানে একাকিত্ব আমার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। আমার একমাত্র বন্ধু এই ডায়েরি।”
রূপমের লেখায় আমার রক্ত জমে গিয়েছিল। সে তার জীবনের প্রতিটি দিন আর রাত লিখে গিয়েছিল, কিন্তু লেখাগুলো শুধু দৈনন্দিন ঘটনা নয়, ছিল অদ্ভুত এবং ভয়ংকর।
দিনগুলো
রূপমের ডায়েরিতে লেখা ছিল:
“রাত ১২ টার পরে কেউ বাইরে যাওয়া নিষেধ, কারণ তখন ছায়াগুলো জীবন্ত হয়।”
“আজ রাতে আমার দরজায় কেউ নক করলো, কিন্তু বাইরে কেউ ছিল না।”
“ছায়াগুলো এখন আমার ঘরেই প্রবেশ করছে।”
প্রতিদিন ডায়েরির পাতায় কিছু না কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, যা সে লিখে চলেছে।
সময়ের সাথে ভয় বাড়ছে
রূপম ডায়েরিতে লিখেছে, একদিন সে তার প্রতিফলন আয়নায় দেখলো, নিজের চেয়ে একজন অচেনা ছায়ামূর্তি তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সে চিৎকার করেও কেউ শুনলো না।
“আমি এখন আর নিরাপদ না,” রূপম লিখেছিল।
ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠার দিকে
আজ আমি সেই শেষ পৃষ্ঠার সামনে বসে আছি। হাতে কাপড়ে মোড়া পাতা। লিখা স্পষ্ট, কিন্তু পড়তে পড়তে আমার হাত কাঁপছে। মনে হচ্ছিল, এই পৃষ্ঠায় এমন রহস্য লুকানো আছে যা মানুষের বোধগম্যতার বাইরে।
শেষ পৃষ্ঠার লেখা:
“যে কেউ এই পৃষ্ঠা পড়বে, সে আমার স্থান দখল করবে। আমি থেকে যাবো তার জীবনের মাঝে, নিঃশ্বাসের মাঝে, আর তার ছায়ায়। আর সে ফিরে আসবে না।”
পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার চারপাশে বাতাস কমে আসলো। হঠাৎ একটা গরম ছোঁয়া বোধ করলাম আমার গলায়। আমি তাকালাম আমার প্রতিফলনের দিকে আয়নায়।
আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে কিছু রূপরেখা ভেসে উঠলো, যেন একটা ছায়ামূর্তি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছিল না, শুধু চোখের গর্তগুলো শূন্য আর কালো।
আতঙ্কের মুহূর্ত
আমি চিৎকার করলাম, কিন্তু আওয়াজ যেন গলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে।
মোবাইল হাতে নিয়েও কোনো সিগন্যাল নেই।
ঘরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে লাগলো, শীতল বাতাস শরীরের ভেতর প্রবাহিত হচ্ছিল। বাতাসের শব্দের মাঝে যেন কেউ বললো—
“এবার তুমি আমার…”
শেষ কথা
আমি ডায়েরির শেষ পাতা বন্ধ করে রাখলাম, কিন্তু আমার চোখ আর মন সেখান থেকে সরছে না। আমি জানি, আমার জীবনের কোনো জায়গায় রূপমের ছায়া থেকে যাবে।
আপনারা যদি কখনো কোনো পুরনো ডায়েরি পান, বিশেষ করে যা শেষ পাতা নিয়ে সতর্ক করে—
সাবধানে থাকুন।
সবসময় শেষ পাতা পড়বেন না।
কারণ হয়তো, সে পাতায় লুকিয়ে থাকে আপনার শেষ গল্পের শুরু।

0 Comments