সারা দিন অফিসের চাপ সামলিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পর আয়নায় নিজের মুখটা দেখতাম খুব অস্বস্তি নিয়ে।
বেশ কয়েকদিন ধরেই আমি লক্ষ্য করছি, আয়নার ভিতরে আমার ছায়ার পাশেই যেন আরেকটা মুখ দেখা যায়—ছায়ার মতো হালকা, মৃদু হাসি, কিন্তু চোখ দুটো ছিল জ্বলজ্বল করে।
প্রথমে ভাবলাম চোখের ভুল, মানসিক চাপ। কিন্তু সেই চেহারা রাতে আমার ঘুমেও এসে ভর করে বসে।
আমার নাম সুমন, বুয়েটের এক্সটেনশন সেন্টারের স্টুডেন্ট, টিএসসি এর পাশে একটা পুরনো ফ্ল্যাটে থাকি একা। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর বাবা আর আমি ঢাকায় উঠে এসেছি।
এক রাতে যখন আমি আয়নায় দেখি, আমার আড়ালে এক ধূসর রঙের মুখ হাসছে...
আমি হাড়ে হাড়ে চিৎকার করতে চাই, কিন্তু গলা আটকে যায়।
চোখের কোণায় পানি জমে যায়।
সেদিন থেকে আয়নাটা যেন আমার জীবনের একমাত্র শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।
🌒 সেই রাত
রাতে আমার মোবাইলের আলোর মুখে আয়নায় দেখা যায় ওর মুখটা পরিষ্কার—দু'চোখ জ্বলজ্বল করছে, যেন আগুন লুকিয়ে আছে।
আমি দরজা বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঘুম আসছিল না।
হঠাৎ শুনতে পেলাম, আয়নার ভেতর থেকে কাঁপুনি ছড়ালো, যেন কেউ আমার দিকে হাত বাড়াচ্ছে।
আয়না ভাঙার শব্দের মতো কাঁপুনি বাড়ল।
আমি দৌড়ে বাথরুমে গেলাম, সেখানেও আয়না, আবার তাকালাম—কেউ নেই।
কিন্তু পিছনে একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল।
👁️🗨️ অতীতের স্মৃতি
একদিন, আংটিপুর গ্রামে আমরা গিয়েছিলাম ছুটিতে।
সেখানে একটা কাহিনী শুনলাম—একজন নারী ৫০ বছর আগে আয়নার সামনে আত্মহত্যা করেছিলেন।
তার নাম ছিল রুবিনা। সবাই বলে সে সেই বাড়ির আয়নায় আজও বাস করে।
বাড়ির আয়না খুললেই তার ছায়া দেখা যায়, আর সে মুখটা চিরদিন হেসে থাকে, যেন বলে—"আমি ফিরে এসেছি"।
আমি ভাবলাম হয়তো এই বাড়িটা সেই সেই ঘর, আর সে আত্মা হয়তো আমার সাথে খেলছে।
🕯️ ভয়াবহ সন্ধ্যা
রাতের অন্ধকারে আবার সেই আয়নায় সে মুখ।
এবার আমার নাম ধরে ডাকল—
— “সুমন... তুমি আমার চোখে চোখ দাও...”
আমি ভয় পেলাম, হাত কাঁপতে লাগল।
কিন্তু মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে দেখলাম আয়নার পেছনে কোনো ছায়া নেই।
ফিরে তাকালাম, আড়ালে আরেকটা মুখ ছিল, কিন্তু ওই মুখটা আমার নয়।
ও হাসছিল ঠাণ্ডা হাসি দিয়ে।
💀 নিস্তব্ধতা
পরদিন সকালে আমার বন্ধুরা এসে জানতে চাইল, কেন আমি ক্লান্ত।
আমি একা থাকার সময় যখন আয়নায় তাকাই, তখন যেন কেউ আমার ওপর নজর রাখছে।
সবার সঙ্গে কথা বলেও ভালো লাগল না।
তারা বলল, "কিছু কর, না হলে সেটা ধ্বংস হয়ে যাবে না।"
🔨 সিদ্ধান্ত
আমি একদিন সেই আয়না ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলাম।
রাত ১২টায় আমি বড় হাতুড়ি নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম—
— “যদি সত্যিই তুমি আয়নার ভিতর থাকে, আজকে তোমার সঙ্গে লড়াই হবে।”
আমি হাতুড়ি ছুঁড়ে দিলাম।
আয়না চূর্ণ হয়ে গেল,
কিন্তু সেই মুখটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল,
চিৎকার শুনলাম ঘরে।
এক মিনিট পর আর কিছুই ছিল না।
🌟 মুক্তি
পরের দিন আমি নতুন আয়না কিনে বসালাম।
কেউ আর সেখানে আত্মার মুখ দেখতে পেল না।
তবে মাঝে মাঝে রাত্রে যখন আয়নায় তাকাই, মনে হয় দূরের কোনো জায়গা থেকে কারো কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে—
— “তুমি আমাকে ভুলে যেও না...”

0 Comments