Ticker

10/recent/ticker-posts

Ad Code

সে এখনো ডাক দেয় ভৌতিক গল্প


ভৌতিক গল্প | সম্পূর্ণ পাঠ্য

রাত তখন প্রায় ১টা। ধানমণ্ডি লেকের ধারে বাতাস কাঁপছে। অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা চারদিকে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো ঝিমঝিম করছে। এমন সময় সাইকেল চালিয়ে ফিরছিল তানিয়া—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী। ওর বাসা লেকের পাশেই এক পুরনো দোতলা বাড়িতে। বাবা-মা দেশের বাইরে, সে একাই থাকে।

বাড়িটা ছিল ওর নানার। নানির মৃত্যুর পর এই বাড়িটা অনেকদিন খালি ছিল। তারপর তানিয়া পড়ার সুবাদে এখানে উঠে আসে। শুরুতে মনে হয়েছিল শান্তিপূর্ণ, শহরের কোলাহল থেকে দূরে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই কিছু ‘অস্বাভাবিক’ ব্যাপার ঘটতে থাকে।

প্রথম রাতেই শুরু হয় —
বাথরুম থেকে অদ্ভুত গলার আওয়াজ।
"এই যে… শুনছো?"

তানিয়া প্রথমে ভাবে পাশের বাসা থেকে আসছে। কিন্তু টানা তিন রাত একই সময়ে, ১টা ৩০ মিনিটে, একই কণ্ঠ—মেয়েলি, কান্নাভেজা।

বাড়ির কাজের মেয়েটি, রোজিনা, একদিন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে—
“আপা, আমি আর থাকুম না। ওই বাথরুমে রাতে কে জানি দাঁইইয়া থাকে! গলা পাই... 'চিনতে পারোনি?' ”

তানিয়া হেসে উড়িয়ে দেয়। "এইসব কুসংস্কার বাদ দাও তো।"

কিন্তু ভয়ঙ্কর ব্যাপার শুরু হয় চতুর্থ রাতে।

তানিয়া হঠাৎ জেগে ওঠে—বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে। সাদা ফ্রক, চুল ভেজা, মুখ ঘুরিয়ে আছে।

"তুমি আমার নাম ভুলে গেছো?"
মেয়েটি ধীরে ধীরে মুখ ঘোরায়। চোখ গর্তের মতো কালো, ঠোঁট নীলচে।
"তুমি তো বলেছিলে, আমি ফিরলে কথা বলবে…"

তানিয়া চিৎকার করে ওঠে। আলো জ্বালায়। কেউ নেই।

সে পরদিনই বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ভোরবেলায় সে দেখে, তার দরজায় একটি চিঠি গুঁজে রাখা।
"তুমি চলে গেলে, আমি কার কাছে ডাকবো?"

চিঠির নিচে কোনো নাম নেই।

ওই দিন থেকে তার চারপাশে ছায়া ঘুরপাক খেতে থাকে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব এক সেকেন্ড দেরিতে নড়ে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটা উধাও হয়ে যায় পলকেই। রাস্তায় হাঁটার সময়, হঠাৎ কেউ ফিসফিস করে কানে বলে—
"তুমি কি আমাকে এখনো মনে করো না?"

তানিয়া কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, কে এই ছায়া?

এক সন্ধ্যায় সে পুরনো অ্যালবাম ঘাঁটতে গিয়ে দেখে, একটি মেয়ের ছবি—সে আর এক বান্ধবী একসাথে লেকের ধারে দাঁড়িয়ে হাসছে। মেয়েটির নাম ছিল শিলি। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় তারা খুব ভালো বন্ধু ছিল। একদিন ঝগড়ার পর তানিয়া আর কখনো তার সঙ্গে দেখা করেনি। আর শোনা গিয়েছিল, শিলি নাকি আত্মহত্যা করেছিল।

তানিয়ার মাথায় বাজ পড়ে।

শিলি!

শিলির সেই দৃষ্টি, সেই অভিমান, সেই কথাগুলো মনে পড়ে—
"তুমি চলে গেলে আমার সব শেষ হয়ে যাবে।"

তানিয়া তখন ভয় আর অনুশোচনায় কাঁপে।

সে ভাবে, হয়তো শিলি ফিরে এসেছে প্রতিশোধ নিতে। অথবা, একটিবার কথা বলার জন্য।

তানিয়া ওই রাতেই শিলির বাড়ির ঠিকানায় যায়। বাড়িটা এখন ধ্বংসপ্রায়, কেউ থাকে না। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখে, দেয়ালে শিলির নাম খোদাই করা।
আর নিচে লেখা—

"আমি তো এখনো ডাক দিই… শুনতে পাও না?"

হঠাৎ জানালার ফাঁক দিয়ে এক ঝটকা বাতাস আসে। তানিয়ার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

সে দেখে, এক মেয়ের ছায়া ধীরে ধীরে উঠে আসছে সিঁড়ি বেয়ে।

"তানিয়া… এবার তুই পালাতে পারবি না।"

তানিয়া দৌড়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ঠিক রাত ১:৩০ বাজে, সে ঘরের দরজা খুলে দেখে, সামনে শিলি দাঁড়িয়ে আছে।
"তুই আমাকে ফেলে গেলি। এখন আমি তোর ছায়া হবো। তুই বাঁচবি না, তানিয়া। তুই আমার জায়গা নেবি। আমি আবার বাঁচতে চাই…"

তারপর কী হলো, কেউ জানে না।

পরদিন পত্রিকায় ছোট এক খবর বের হয়—
"ধানমণ্ডির এক পুরনো বাড়িতে যুবতী ছাত্রী নিখোঁজ, ঘরে শুধু পাওয়া গেছে—'তুমি তো আমাকে চিনতে পারোনি' লেখা একটি আঙুলের ছাপ।"

লোকজন বলে, ওই বাড়ির জানালার পাশে কেউ মাঝরাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
সাদা ফ্রকে, ভেজা চুলে, নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে লেকের দিকে।

যদি তুমি ওদিকে যাও…
আর যদি ১:৩০ বাজে ঘড়িতে…
তবে সাবধান—
"সে এখনো ডাক দেয়…"


শেষ।


Post a Comment

0 Comments