Ticker

10/recent/ticker-posts

Ad Code

🌑 রাত ৩:১৫

ভৌতিক গল্প


রাফিন নতুন একটা বাসায় উঠেছে মাত্র এক সপ্তাহ হলো। পুরনো ঢাকার কাঁটাবন এলাকায় চার তলার একটা ফ্ল্যাটে সস্তায় ভাড়া পাওয়া গিয়েছিল। বাসাটা বড় কিছু না, কিন্তু ছিমছাম, নিরিবিলি। যেটা অবাক করার মতো, সেটা হলো—এতো ভালো লোকেশনে, এমন দাম কম কেমন করে হয়?

বাড়িওয়ালা, এক বৃদ্ধ লোক, বাসা দেখাতে এসে এক অদ্ভুত কথা বলেছিলেন—
"রাতে আয়নার সামনে দাঁড়াইও না।"
রাফিন ভেবেছিল এটা পুরনো দিনের মানুষদের কুসংস্কার।

প্রথম রাতে ঠিকমতো ঘুম হল না। বাসার সাইলেন্স, পাখার শব্দ আর বাইরের কুকুরের ডাক মিলিয়ে একটা অস্বস্তি তৈরি করেছিল। রাত প্রায় তিনটার দিকে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলেই তার প্রথম নজর পড়ে দেয়ালের আয়নায়। একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করে সে—ঘড়ির কাঁটা ৩:১৫ মিনিটে দাঁড়িয়ে।

সে ভাবে, ঘড়ি হয়তো খারাপ। কিন্তু ফোনে সময় দেখেও দেখে ঠিক একই—৩:১৫।

পরদিন বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে। হয়তো স্বপ্ন দেখছিল।

কিন্তু পরের দিন একই ঘটনা ঘটে। আবার ঘুম ভাঙে ঠিক সেই সময়ে। আবার আয়নায় চোখ যায়। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে গিয়ে মনে হয়, নিজের চেহারায় একটা অদ্ভুত কৌতুক রয়েছে। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, অথচ সে হাসছে না।

তৃতীয় রাতে রাফিন আর নিজেকে বোঝাতে পারে না। এবার সে একটা ফোন রেখে দেয় রেকর্ডিং মোডে, ঠিক তার ঘুমানোর দিকে তাক করে। আরেকটা ক্যামেরা দেয় আয়নার দিকে।

রাতে আবার ৩:১৫। চোখ খুলতেই সে দেখে আয়নায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে—নিজের মতো দেখতে হলেও সেই মানুষটা "সে" নয়। চোখ দুটো লালচে, ঠোঁটে এক বিকৃত হাসি, আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার—প্রতিবিম্বটা তার সঙ্গে একসাথে নড়ে না।

সে সোজা উঠে পড়ে লাইট জ্বালায়। আয়নায় এখন শুধু নিজের স্বাভাবিক চেহারা।

পরদিন ভিডিও দেখে শিউরে ওঠে। আয়নার ক্যামেরায় সে দেখতে পায়, ৩:১৫ মিনিটে কেউ ধীরে ধীরে আয়নার ভিতর থেকে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। ধীরে ধীরে, চোখ না পিটিয়ে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু ঘরের ক্যামেরায় কিছুই ধরা পড়েনি।

সেদিন সন্ধ্যায় রাফিন তার বন্ধু রোদেল আর সজীবকে ডাকে। তারা প্রথমে হাসাহাসি করে, ভাবে এটা হয়তো এডিট করা বা রাতজাগার ফল। কিন্তু আয়নার সামনে গিয়ে রোদেল হঠাৎ থেমে যায়। তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে। সে কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আমি মনে হয়... নিজের পেছনে... একটা মুখ দেখলাম।”

তারা তখন বাড়িওয়ালার কাছে যায়। বৃদ্ধ লোকটা প্রথমে কিছু বলতে চায় না। পরে এক কাপ চা খাওয়ার পর মুখ খুলে যা বলে, তা শোনার পর তিনজনেই স্তব্ধ।

"এই ঘরের আয়নাটা অনেক পুরনো। আমার স্ত্রীর ছিল। ও এই ঘরেই আত্মহত্যা করে। ঠিক রাত ৩:১৫-তে। তারপর থেকে যেই এই ঘরে ওঠে, প্রথমে রাতে ঘুম ভাঙে। এরপর আয়নার ভিতরে তার প্রতিবিম্ব বদলে যায়। আর এক সময়... আয়নার ভিতরে চলে যায় সে নিজেই। ওর জায়গায় থেকে যায় অন্য কেউ।"

সজীব বলে, "আপনি কী বলছেন এগুলো! এগুলো ফালতু গল্প!"

বৃদ্ধ লোকটা হেসে ফেলে। “দেখো, আমি কাউকে বাধা দেই না। শুধু সাবধান করি। তোমরা চাইলে থাকতে পারো। তবে আয়নার সামনে বেশি যেয়ো না। এবং কখনোই একা ৩:১৫ মিনিটে তাকিয়ো না।”

তারা বাসায় ফিরে আসে। রাফিন ভাবে, কিছুদিন অন্য কোথাও থেকে যাবে। কিন্তু রাতটা আর একবার পার করতে হবে।

রাত বারোটায় সে দরজা-জানালা ভালো করে বন্ধ করে, সব আলো জ্বালিয়ে ঘুমাতে যায়।

কিন্তু তার ঘুম ভাঙে—আবার ঠিক ৩:১৫-তে।

এইবার সে শ্বাস নিতে পারে না। মনে হয়, পুরো ঘরটা ঠান্ডা বরফে ঢাকা। বাতাস ভারী। বিছানায় বসে সে দেখে—আয়নার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

কেউ না—ঠিক যেন তারই মতো দেখতে, কিন্তু অন্ধকার, বিকৃত, চুপচাপ।

হঠাৎ আয়নার সেই ছায়া মুচকি হাসে। তারপর ধীরে ধীরে আয়নার কাচ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। তার মুখ ঠিক রাফিনের মতোই। তবে চোখ দুটো গর্তের মতো কালো।

“তুমি তো অনেকদিন জায়গাটা দখল করেছো। এবার পালা বদলাও,” ফিসফিস করে বলে ছায়াটা।

রাফিন পেছনে হঠাৎ সজোরে ধাক্কা খায়। আর তার চেতনা লোপ পায়।

পরদিন সকালে পুলিশ এসে পায় একটি নিথর দেহ—রাফিন, আয়নার সামনে পড়ে আছে। ডাক্তার বলে, হৃদযন্ত্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।

কিন্তু ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো—আয়নাটা তখন ঝকঝকে পরিষ্কার, আর সেখানে দেখা যাচ্ছে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে, হালকা হাসি মুখে, চোখ দুটো লালচে।

সেই আয়না এখনও রয়েছে ঘরে। এবং এখনো... রাত ৩:১৫ বাজে...


শেষ।


Post a Comment

0 Comments